নাটোরের গুরুদাসপুরে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি স্কুল ভবন ব্যবহারের চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ধানুরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২২ লাখ টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি ভেঙে এর মালামাল মাত্র এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই ভবন ভাঙা ও মালামাল বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে চরম রহস্য ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিডিপি) অর্থায়নে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নে বিদ্যালয়টিতে একটি একতলা বিজ্ঞান ভবন ও দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুনে হুট করে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। অথচ তখনো নতুন চারতলা ভবন নির্মাণের কোনো অনুমোদনই পাওয়া যায়নি। পুরোনো ভবনের জায়গা খালি দেখিয়ে পরবর্তীতে নতুন ভবনের জন্য আবেদন করা হয়। গত ২৩ আগস্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর গত ২৬ আগস্ট (বুধবার) নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চারতলা নতুন ভবনের প্রথম তলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
ভবনটি ভাঙার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, এলজিইডি এবং ইউজিডিপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কাউকেই এ বিষয়ে কখনোই অবহিত করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থে নির্মিত ভবন ভাঙার ক্ষেত্রে কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং মালামালের দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ গোপনীয় রাখা হয়েছে। মাইকিং করে মালামাল বিক্রির কথা শোনা গেলেও এর কোনো সঠিক দরপত্র বা স্বচ্ছতা ছিল না।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি মোতালেব দাবি করেন, বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্যই ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে এবং মালামাল এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
তবে বর্তমান সভাপতি মো. রনি ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য দিয়ে বলেন, ‘পুরোনো ভবন ভাঙার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। প্রধান শিক্ষকের কাছে বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বললেও তিনি তা দেননি। ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই প্রধান শিক্ষক নিজের খেয়ালখুশিমতো এসব করেছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেনের দাবি, চারতলা নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার জন্যই পুরোনো ভবনটি অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম মেনে মাইকিং করেই ভবন ভাঙা ও মালামাল বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি করলেও, বিক্রির ওই এক লাখ টাকা কীভাবে বিদ্যালয়ের ফান্ডে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে—সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
ইউজিডিপি কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার বলেন, ‘২৩ লাখ টাকার কাছাকাছি ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। সরেজমিন তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।’
সরকারি অর্থে নির্মিত একটি ভবন এত অল্প সময়ে কার ইন্ধনে এবং কোন বিধিমালার আলোকে ভেঙে ফেলা হলো—তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।