একজন মানুষকে হারানোর কষ্ট হয়ত একসময় চোখের পানিতে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু একজন মানুষ কোথায়—বেঁচে আছেন, নাকি নেই—তা না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার কষ্টের কোনো ভাষা নেই। এই অপেক্ষা একদিকে যেমন গভীর বেদনার, অন্যদিকে তেমনি এক অনিশ্চিত জীবনের নাম।

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি শুধু গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি সেইসব মায়ের কান্না, সেইসব স্ত্রীর অপেক্ষা, সেইসব সন্তানের শূন্যতা এবং সেইসব পরিবারের দীর্ঘশ্বাস স্মরণ করার দিন, যাদের প্রিয়জন একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেছেন। প্রিয় মানুষটি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর পার করেছে।

বাংলাদেশও এই নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের নিষ্ঠুর শাসনামলে গুমের অভিযোগ ক্রমেই গুরুতর ও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন। এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই দীর্ঘ অন্ধকারের পর আজ রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুমের শিকার পরিবারগুলোর কষ্টকে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় হিসেবে দেখেননি। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী স্বজনদের কান্না ও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা শুনে তিনি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা এবং অন্যায়কারীদের আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

বর্তমান সরকার শুধু অতীতের ঘটনা স্মরণ করতে চায় না; ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মানুষ গুমের শিকার না হন, সেই নিশ্চয়তাও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ২০২৬ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বাংলাদেশ আর কখনো গুমের অন্ধকারে ফিরে যাবে না। এই রাষ্ট্রে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থাকবে, মানুষের নিরাপত্তা থাকবে, আইনের শাসন থাকবে এবং অপরাধের বিচার হবে। মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে—এমন একটি বাংলাদেশই হোক আমাদের প্রত্যাশা।