রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনার আগে আরও দুটি হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার নেপথ্যে মাদক ব্যবসা, অধিপত্য ও বিরোধের জের রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি ‘মাদকসেবী ও কারবারির আখড়া’ হিসেবেও পরিচিত।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি নগরীর মাছুয়াপাড়া সংলগ্ন তাঁতীপাড়ায় খুন হন অটোচালক আমিনুল ইসলাম (৩৫)। গাঁজা কাটার চাকুর আঘাতে তার প্রাণ কেড়ে নেন বিজয় মোহান্ত নামে এক মাদকাসক্ত। এরপর ১০ এপ্রিল মাছুয়াপাড়ায় পূর্ববিরোধের জেরে রাকিব হাসান (২০) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে রাকিবকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর মাছুয়াপাড়ায় দুটি বাড়ি ও ১০টি দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। আতঙ্কে কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এসব ঘটনার রেশ না কাটতেই সেই মাছুয়াপাড়াতেই ঘটেছে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। গত ২২ আগস্ট শনিবার সেখানে বসবাসরত অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
বাসার ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষকসহ একে একে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্পর্কে তারা দুজন আত্মীয়।
গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস রংপুর সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করতেন আর সিদ্ধার্থ দাস প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারির দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করতেন।
এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন তারা।
ধরাছোঁয়ার বাইরে মাদক কারবারিরা
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মাদক কারবারিরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ যার কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন, সেই মাদক কারবারি প্রশান্ত ঘটনার পর আত্মগোপনে গেছেন। এমনকি ওই এলাকায় যারা মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত তারাও এখন গা ঢাকা দিয়েছেন।
লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে মাছুয়াপাড়ার কেউই মাদক কারবারিদের নাম পরিচয় মুখে আনছেন না। এমনকি গণমাধ্যমের সাথে মাদক সেবনকারী ও কারবারিদের বিষয়ে কথা বলতেও তাদের অনেকের মধ্যে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
ওই এলাকার অন্তত ২০ জন নারী ও পুরুষের সাথে কথা হলে তারা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, মাছুয়াপাড়া ও আশপাশের কয়েকটি স্থানে রাত পর্যন্ত মাদক সেবন ও কেনাবেচা চলে। বিশেষ করে শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর দুই সেতুর আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যার পর মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বাড়ে এবং রাত ১১টা-১২টার পর ওই পথ দিয়ে চলাচল করতে ভয় পান স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, কামাল কাছনা, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া, নূরপুরসহ আশপাশের এলাকায় গাঁজা বিক্রি হয় এবং কেউ কেউ ইয়াবাও বিক্রি করেন। গাঁজা সেবনকে অনেকে অপরাধ হিসেবে দেখেন না বলে রাত-বিরাতে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে একসঙ্গে বসে গাঁজা সেবন করতে দেখা যায়।
কারা মাদক সরবরাহ করছে এবং তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, আমার ছেলে কাদের কাছ থেকে মাদক কিনতো সেটা আমি জানি না এবং এটি জানার প্রয়োজনও নেই। এসবের সাথে কারা জড়িত তা পুলিশ ভালো জানে বলে উল্লেখ করে তিনি পাড়ার প্রতিটা ছেলেকে মাদক থেকে দূরে থাকার অনুরোধ জানান।
রংপুরে ৪৩ সীমান্তপথে ঢোকে মাদক
নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও হাজার হাজার মামলা হওয়ার পরও ভারতীয় সীমান্তবর্তী রংপুর বিভাগের আট জেলায় মাদকের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও বিভিন্ন ধরনের মাদক।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী অন্তত ৪৩টি রুট ব্যবহার করে দেশে মাদক প্রবেশ করছে। এসব সীমান্ত দিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন ও নেশাজাতীয় ইনজেকশন দেশে ঢুকছে।
পরে রংপুরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এগুলো পাচার করা হচ্ছে। রংপুর নগরীর কেডিসি, কেরানীপাড়া, নূরপুর, মহাদেবপুর, গোমস্তাপাড়া, আলমনগর কলোনী, সেন্ট্রাল রোড, শালবন মিস্ত্রিপাড়া, শাপলা চত্বর চামড়াপট্টি, জুম্মাপাড়া, বাবুখাঁ, আমাশু কুকরুল, দর্শনা রেলগেট, আলমনগর বাবুপাড়া, হারাগাছ, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে।
তিন মাসে মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ১৬২৬
এদিকে রংপুর মহানগরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে গত তিন মাসে মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় এক হাজার ৬২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ১১.৫২৫ কেজি গাঁজা, ৬৩১ পিস ইয়াবা, ৪১.৯ গ্রাম হেরোইন, ৩০ পিস ট্যাপেন্ডল ট্যাবলেট, ৭২ বোতল এসকাফ (ফেনসিডিল সদৃশ) এবং ২ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য পাঁচ লাখ ৯৬ হাজার ৫০ টাকা। একই সময়ে ৬০টি মাদক মামলা রুজু করে ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেসব কারণে মাদক ‘হটস্পটে’ পরিণত রংপুর বিভাগ
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সীমান্তঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান, সংঘবদ্ধ মাদক ও চোরাকারবারি চক্রের তৎপরতা, মাদকপাচারের সহজ রুট, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতির কারণে রংপুর বিভাগ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম মাদক ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক মো. আল মামুন বলেন, আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে মাদকের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মতামত দেওয়া হলেও মাদকসেবী ও কারবারিরা সেভাবে আইনের আওতায় আসছে না।
তিনি আরও বলেন, চার মাস আগে মাছুয়াপাড়ায় যে খুনের ঘটনা ঘটেছিল, সেটিও মাদককেন্দ্রিক ছিল এবং খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছিল ওই এলাকার ৯০ ভাগ পরিবার মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি ১০ ভাগের একটি ছিল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যা এড়ানো যেত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী জানান, মাছুয়াপাড়ায় চারজন হত্যার ঘটনার পর প্রশান্তসহ অন্য মাদক কারবারিরা গা ঢাকা দিলেও সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে এবং পুলিশি অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত আছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে রংপুর শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা মাদক এবং চার খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনই দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিল। মাদক কোনো ব্যক্তিগত বা বাহিনীর সমস্যা নয় বরং এটি সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমান্ত হয়ে অবৈধ চোরাচালান ও ইয়াবার মতো মাদক প্রবেশ বন্ধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং চাহিদা কমাতে মাদকসেবীদের চিকিৎসার উদ্যোগ নিতে হবে।