রাজবাড়ী জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের ভয়াবহ সংকট পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। জেলার মোট ৪৮১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৭৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে, যা মোট পদের প্রায় ৫৮ শতাংশ। এর ফলে বাধ্য হয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাজ চালাতে হচ্ছে।

প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে এই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার সামগ্রিক মানের ওপর।

সরেজমিনে গোয়ালন্দ পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের নগরবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরিসহ মোট ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন শিক্ষক। তাদের মধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিদিন প্রশাসনিক নথিপত্র প্রস্তুত, মিড-ডে মিল (ফিডিং) কার্যক্রম তদারকি, বিভিন্ন দাপ্তরিক তথ্য অনলাইনে প্রেরণ এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে গিয়ে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে তিনি শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের বাকি দুই শিক্ষককে একসঙ্গে দুটি করে শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলার আরও শতাধিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে একই ধরনের নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা জানান, দীর্ঘকাল ধরে পদোন্নতি প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদান একসঙ্গে সামলানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, যোগ্য সহকারী শিক্ষকদের দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে এই শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে।

গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান খান জানান, প্রধান শিক্ষকের পদগুলো শূন্য থাকায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্তর দায়িত্ব দিয়ে শতভাগ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তবে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠনের কাজ চলমান রয়েছে এবং কমিটি গঠিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান বলেন, জেলায় প্রায় ৫৮ শতাংশ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে অবিহিত করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই শিক্ষক সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে হলে অবিলম্বে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ, যোগ্য সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি প্রদান এবং শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনিক এই সংকটের কারণে শিক্ষার মান আরও অবনতির শঙ্কা রয়েছে।